রিয়াজুল ইসলাম বাচ্চু, নিজস্ব প্রতিবেদক:
একটি জাতি কতটা উন্নত, তা নির্ভর করে সেই জাতির শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। আর শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণশক্তি হলেন শিক্ষক। আমরা প্রায়ই ‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’ বলে স্লোগান দেই, কিন্তু সেই মেরুদণ্ড যারা নির্মাণ করেন, সেই শিক্ষকদের জীবনমানের উন্নয়ন নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রীয় চিন্তাভাবনা বরাবরই অবহেলিত থেকেছে। বাস্তবতা হলো, শিক্ষকদের পেটে ক্ষুধা আর মনে দুশ্চিন্তা রেখে একটি মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা অসম্ভব। যত আধুনিক কারিকুলামই আসুক বা যত ঝকঝকে ভবনই নির্মিত হোক—শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকারী শিক্ষক যদি মানসিকভাবে স্বস্তিতে না থাকেন, তবে সব উদ্যোগই ব্যর্থ হতে বাধ্য।
১. অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও শিক্ষার মান
শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি মহান ব্রত। কিন্তু বর্তমান বাজারমূল্যের ঊর্ধ্বগতির যুগে একজন শিক্ষক যদি তার সামান্য বেতন দিয়ে পরিবার চালাতে হিমশিম খান, তবে তিনি পাঠদানে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন না। যখন একজন শিক্ষককে টিকে থাকার তাগিদে টিউশনি বা অন্য কোনো খণ্ডকালীন কাজের পেছনে ছুটতে হয়, তখন তার সৃজনশীলতা ও গবেষণার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। মেধাবীরা আজ শিক্ষকতা পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে কেবল আর্থিক দৈন্যতার কারণে। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি চাইলে সবার আগে শিক্ষকদের জন্য একটি সম্মানজনক বেতন কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
২. সামাজিক মর্যাদা ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
উন্নত বিশ্বে শিক্ষকদের যে সামাজিক মর্যাদা দেওয়া হয়, আমাদের দেশে তা অনুপস্থিত। একজন শিক্ষক যখন সামাজিকভাবে অবজ্ঞার শিকার হন বা রাজনৈতিক চাপের মুখে থাকেন, তখন তার আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরে। শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নের অর্থ কেবল বেতন বৃদ্ধি নয়, বরং তাদের পেশাগত স্বাধীনতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এর অন্তর্ভুক্ত। একজন মর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষকই পারেন একটি আত্মমর্যাদাশীল প্রজন্ম গড়ে তুলতে।
৩. অবকাঠামো বনাম মানবসম্পদ
আমরা হাজার কোটি টাকা খরচ করে স্কুল-কলেজের ভবন নির্মাণ করি, ল্যাবরেটরি বানাই। কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রাণহীন ইটের দেয়াল শিক্ষা দেয় না; শিক্ষা দেন শিক্ষক। বিনিয়োগটা যদি সঠিক জায়গায় না হয়, তবে সেই অবকাঠামো শুধু ধ্বংসাবশেষ হিসেবেই পড়ে থাকবে। তাই রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার তালিকায় ইট-পাথরের চেয়ে রক্ত-মাংসের মানুষের (শিক্ষক) উন্নয়ন আগে থাকা উচিত।
৪. বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও আমাদের অবস্থান
ফিনল্যান্ড, জাপান বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে মেধা তালিকার শীর্ষে থাকা তরুণরাই শিক্ষকতায় আসেন। কারণ সেখানে শিক্ষকদের জীবনমান এবং রাষ্ট্রীয় সুবিধা সর্বোচ্চ পর্যায়ের। আমরা যদি বিশ্বমানের নাগরিক তৈরি করতে চাই, তবে আমাদের শিক্ষকদের জীবনমানকেও বিশ্বমানে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার বা রূপান্তর নিয়ে যত আলোচনাই হোক না কেন, শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নই হলো এর কেন্দ্রবিন্দু। শিক্ষকদের অবহেলায় রেখে কোনো দেশ কোনোদিন উন্নত হতে পারেনি, পারবেও না। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, শিক্ষকের পেছনে ব্যয় করা প্রতিটি টাকা আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিনিয়োগ। তাই সময় এসেছে শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ও বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নেওয়ার। অন্যথায়, আমাদের সকল উন্নয়ন পরিকল্পনা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
লেখক পরিচিতি:
ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম: কলামিস্ট, সমাজসেবক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনীতিবিদ।
চেয়ারম্যান: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র।
চেয়ারম্যান: সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট।
চেয়ারম্যান: ডেমোক্রেসি রিসার্চ সেন্টার (ডিআরসি)।
https://slotbet.online/