– ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার জেরে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে চূড়ান্ত বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলীয় তদন্তে বিষয়টি ‘নৈতিক স্খলন’ হিসেবে প্রমাণিত হওয়ায় তাদের গঠনতন্ত্রের ৬২ ধারা অনুযায়ী এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে প্রশ্ন উঠেছে, দল থেকে বহিষ্কৃত হলেই কি তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়ে যাবে?
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ চ্যানেল ২৪-কে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, কেবল দল বহিষ্কার করলেই আইন অনুযায়ী সরাসরি কোনো এমপির পদ শূন্য হয় না। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কেবল স্বেচ্ছায় দলত্যাগ করলে বা সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলেই আসন শূন্য হওয়ার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। তবে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ এবং সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী স্পিকার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে পাঠালে শুনানির মাধ্যমে ইসি এই বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারে।
সাংবিধানিক অনুচ্ছেদ ও আন্তর্জাতিক নজির
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী একজন ব্যক্তি মূলত ৯টি সুনির্দিষ্ট কারণে জাতীয় সংসদের সদস্য থাকার যোগ্যতা হারান:
স্বেচ্ছায় পদত্যাগ: এমপি নিজে পদত্যাগ করলে।
দলীয় পদত্যাগ ও বিপক্ষ ভোট: দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে (অনুচ্ছেদ ৭০)।
আইনি অযোগ্যতা: আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ বা দেউলিয়া ঘোষিত হলে, কিংবা বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জন করলে।
দণ্ড ও লাভজনক পদ: নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ড হলে কিংবা লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকলে।
অনুপস্থিতি: সংসদে টানা ৯০ দিন অনুপস্থিত থাকলে।
আইনগত দৃষ্টিতে, যুক্তরাজ্য বা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দল বহিষ্কার করলেও সদস্য পদ বহাল থাকে এবং তিনি স্বতন্ত্র (Independent) এমপি হিসেবে গণ্য হন—যেমনটি লেবার পার্টির সাবেক নেতা জেরেমি করবিনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে।
তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টির ভিন্ন আইনি ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে। ১৯৯৮ সালে বিএনপির সংসদ সদস্য হাসিবুর রহমান স্বপন ও ডা. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন দলের অনুমতি ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগ দিলে দল থেকে বহিষ্কৃত হন। পরবর্তীতে উচ্চ আদালত ও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে তাঁদের পদ বাতিল হয় এই যুক্তিতে যে, দলের আদর্শের বরখেলাপ ও সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়া কার্যত পদত্যাগেরই সামিল। যেহেতু জনগণ দলীয় মার্কায় ভোট প্রদান করে, তাই আদর্শচ্যুতির পর স্বতন্ত্র হওয়ার সুযোগ সংবিধানের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করতে পারে।
রাজনৈতিক দল ও ধার্মিক সমাজের জন্য শিক্ষা
আইনি জটিলতার পাশাপাশি এই ঘটনাটি সামাজিক ও আদর্শিক জায়গায় বিশাল এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী একটি অনুশাসনভিত্তিক দল হওয়ায় তাঁদের এমপির এই নৈতিক স্খলন দলের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। তবে বাস্তবতা হলো, ভুলত্রুটি ও পদস্খলন যেকোনো মানুষের সমাজেই ঘটতে পারে; পরম নিখুঁত কোনো ‘ইউটোপিয়া’ বাস্তবে সম্ভব নয়।
এই ঘটনা থেকে আমাদের সমাজ ও ধার্মিক জনগোষ্ঠীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা প্রয়োজন:
জাজমেন্টাল মনোভাব পরিহার: সমাজে ‘কম ধার্মিক’ বা অন্যদের দিকে সহজে আঙুল তোলা বা মোরাল পুলিশিং করার প্রবণতা কমানো উচিত। প্রলোভন ও পাপ মানুষের যেকোনো সময় হতে পারে, তাই অন্যের ভুলের বিচারক না হয়ে নিজের তওবা ও আত্মশুদ্ধিতে মনোযোগী হওয়া দরকার।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মর্যাদা: ইসলামে প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষিত, যা সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
দলের আপসহীন অবস্থান: দল হিসেবে রাজনৈতিক সংস্থাসমূহকে অপরাধের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিলে ভবিষ্যতে দলীয় নেতাকর্মীরা নৈতিকতার সীমা লঙ্ঘনে সতর্ক থাকবে।
পরিশেষে, গাজী নজরুল ইসলামের এমপি পদ থাকবে কি থাকবে না, তা সংবিধান, স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তবে এটি স্পষ্ট যে, জাতীয় রাজনীতিতে সুস্থ ধারা ও নৈতিকতা বজায় রাখতে হলে দলীয় শৃঙ্খলা এবং সাংবিধানিক কাঠামোর সঠিক প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক পরিচিতি:
ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম
কলামিস্ট, সমাজসেবক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনীতিবিদ।
চেয়ারম্যান: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র, সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট, এবং ডেমোক্রেসি রিসার্চ সেন্টার (ডিআরসি)।
নির্বাহী পরিচালক: জিয়া ইন্টারন্যাশনাল একাডেমী (জিয়া)।
https://slotbet.online/