নিজস্ব প্রতিবেদক :
২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর উদীয়মান তরুণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্যতম পরিচিত মুখ, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি আর নেই। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন।
শরিফ ওসমান হাদি সাধারণভাবে ‘ওসমান হাদি’ নামেই পরিচিত ছিলেন। ১৯৯৩ সালে দক্ষিণাঞ্চলের ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। তার পিতা মরহুম মাওলানা আব্দুল হাদি নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার একজন সম্মানিত শিক্ষক ছিলেন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে হাদি ছিলেন সবার ছোট।
শিক্ষাজীবনের শুরুতে বাবার কর্মস্থল নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসায় তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন তিনি। পরবর্তীতে ঝালকাঠি জেলার ঐতিহ্যবাহী নেছারাবাদ কামিল মাদরাসা থেকে আলিম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা সম্পন্ন করেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন একজন পারিবারিক মানুষ। রাজধানীর রামপুরা এলাকায় বসবাস করতেন এবং স্ত্রী, এক পুত্রসন্তান ও মাকে নিয়ে তার সংসার ছিল।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে ওসমান হাদি ছিলেন সক্রিয় ও দৃশ্যমান নেতৃত্বে। রামপুরা অঞ্চলের সমন্বয়ক হিসেবে আন্দোলন সংগঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। জুলাই শহিদদের ন্যায্য অধিকার আদায়, ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতা এবং ‘ন্যাশনাল অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ইউনিটি’ প্ল্যাটফর্মের ব্যানারে রাজপথে তার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
সরকার পতনের আন্দোলনে তার ভূমিকা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে সরব অবস্থান অল্প সময়ের মধ্যেই দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। সমর্থন ও সমালোচনার মধ্য দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে একটি পরিচিত রাজনৈতিক মুখ হয়ে ওঠেন।
গণঅভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা ও দাবি-দাওয়ার আলোকে তিনি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্ল্যাটফর্মের মূল লক্ষ্য ছিল আধিপত্যবাদবিরোধী সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঢাকা-৮ আসন (মতিঝিল, শাহবাগ, রমনা, পল্টন ও শাহজাহানপুর) থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন ওসমান হাদি।
রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় তিনি ছিলেন প্রচলিত ধারার বাইরে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নেতৃত্বে রেখে একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। একইসঙ্গে বিএনপি ও পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তেরও কঠোর সমালোচক ছিলেন তিনি। তার মতে, পুরোনো ধাঁচের রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতায় এলে কোনো সরকার দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও আপসহীন মনোভাব নিয়েও তিনি বিভিন্ন সময়ে মন্তব্য করেছেন।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিনভর তার সুস্থতা কামনায় আলোচনা চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত দিবাগত রাত পৌনে ১০টার দিকে তার মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত হয়।
https://slotbet.online/