নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা আজ এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। জেলা আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত লাখ লাখ মামলার ফাইল বছরের পর বছর ধরে বিচারাধীন অবস্থায় পড়ে আছে। কোনো কোনো মামলা তিন দশকেরও বেশি সময় পার করলেও এখনো নিষ্পত্তির মুখ দেখেনি। এ বাস্তবতা কেবল প্রশাসনিক অকার্যকারিতার পরিচয় নয়; এটি সরাসরি ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সাংবিধানিক অধিকারের ওপর আঘাত।
উচ্চ আদালতে এমন বহু মামলা রয়েছে, যেগুলো দুই শত থেকে তিন শতবার পর্যন্ত তারিখ পড়েছে, অথচ কার্যকর শুনানি একবারও হয়নি। নিম্ন আদালতেও একই চিত্র বিরাজমান। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শুনানি না করেই একের পর এক তারিখ নির্ধারণ করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও ‘ওপেন কোর্টে’ বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা না করে ছয় মাস বা তারও বেশি সময় পর নতুন তারিখ দেওয়া হচ্ছে, যা বিচারিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন তোলে।
এই দীর্ঘসূত্রতার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন মামলার বাদীরা। প্রতিটি নতুন তারিখ মানে নতুন করে যাতায়াত খরচ, আইনজীবীর ফি, কর্মঘণ্টার ক্ষতি এবং মানসিক চাপ। বহু বাদী বছরের পর বছর এই ভোগান্তি সহ্য করতে করতে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেকে ন্যায়বিচার পাওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন। ফলে বিচার ব্যবস্থা অনেকের কাছে আশ্রয়ের জায়গা না হয়ে এক প্রকার অন্তহীন দুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
ন্যায়বিচার বিলম্বিত হলে তা কার্যত ন্যায়বিচার অস্বীকারের শামিল—এই নীতি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। অথচ আমাদের দেশে সেই বিলম্বই যেন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রূপ নিয়েছে। বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ। সেখানে দীর্ঘসূত্রতা, অস্বচ্ছতা ও দায়িত্বহীনতা গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য মারাত্মক হুমকি।
এই প্রেক্ষাপটে বিচারপ্রার্থীদের ন্যায্য দাবি—অপ্রয়োজনীয়ভাবে বারবার তারিখ নির্ধারণ বন্ধ করতে হবে। কোনো মামলায় সীমিত সংখ্যক শুনানির মধ্যেই বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে এবং প্রতিটি ধাপ ‘ওপেন কোর্টে’ স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে বিচার ব্যবস্থার ওপর কার্যকর নজরদারি, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বিচারক ও প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
বিচার ব্যবস্থার সংস্কার এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি সময়ের অপরিহার্য দাবি। অন্যথায় আদালতের তাকজুড়ে জমে থাকা মামলার ফাইলগুলো ভবিষ্যতে কেবল বিচারহীনতার ইতিহাসই বহন করবে—যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য চরম লজ্জাজনক।
লেখক : ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম
কলামিস্ট, সমাজসেবক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনীতিবিদ
চেয়ারম্যান — বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র
চেয়ারম্যান — সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট
চেয়ারম্যান — ডেমোক্রেসি রিসার্চ সেন্টার (ডিআরসি)
https://slotbet.online/